হাসান কাজল এর প্রতিবেদন।
প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তবে সম্প্রতি দেশের ভেতরে উৎপত্তিস্থল এমন ভূমিকম্পের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ও হালকা এসব ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১২৬টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আমাদের এখানে যে লকড জোন আছে সেখানে ঘর্ষণশক্তির পরিমাণ অনেক বেশি। এখানে ৮০০ থেকে ১০০০ বছর আগে বড় ভূমিকম্প হয়ে যে শক্তি বের হয়ে গেছে, সেখানে নতুন করে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। এখানে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে।
বাংলাদেশের ভেতরে-বাইরে অনেকগুলো ফাটল আছে। হিমালীয় মুখ্য ফাটল আজ থেকে সাড়ে ৫ কোটি বছর আগে মিলিত ভারত-বার্মা পাত ইউরেশীয় পাতকে সজোরে ধাক্কা দিলে হিমালয় জেগে ওঠে। ধাক্কার পর ভারতীয় পাত ইউরেশীয় পাতের নিচ দিয়ে গতিশীল হয় । এইভাবে প্রায় ২,২০০ কিলোমিটার লম্বা হিমালীয় সাবডাকশন জোন গঠিত হয়। গতিশীল ভারতীয় পাতের চাপে ইউরেশীয় পাতে শক্তি জমা হয় যা আকস্মিকভাবে মুক্ত হলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। স্লেমোনের সূত্রানুযায়ী যা ছিল সর্বোচ্চ ৯.২ – ৯.৩মাত্রার।
বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত সবচেয়ে লম্বা ফাটলটা হলো চট্টগ্রাম-আরাকান ফাটল যা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূল ও মিয়ানমারের উপকূলে অবস্থিত। ৯১২ কিলোমিটার লম্বা এই ফাটল সর্বোচ্চ ৮.৮ – ৮.৯ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপন্ন করতে পারে। ১৭৬২ সালে এই ফাটল থেকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। সমস্ত শক্তি ছেড়ে দেওয়ায় তখন ৮.৫ – ৮.৮ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপন্ন হয় যার ফলে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ বদলে যমুনা নদীর জন্ম হয়। এই ফাটলের অবস্থান চট্টগ্রাম বিভাগে তাই এখান থেকে ভূমিকম্প তৈরি হলে সেখানেই ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হবে। সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্তে অবস্থিত ফাটলটার নাম হলো দাউকি। ৩৫৫ কিলোমিটার লম্বা এই ফাটল সর্বোচ্চ ৮.৩ – ৮.৪ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপন্ন করতে পারে। ১৮৯৭ সালে এই দাউকি ফাটল এবং ভারতের ওলধাম ফাটল মিলিতভাবে ৮.২ – ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করে । ঢাকা শহরের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাটল হলো মধুপুর ফাটল যার দক্ষিণভাগ সরাসরি ঢাকা শহরের মধ্যে পড়ে। ১১৮ কিলোমিটার এই ফাটল দেশের সবচেয়ে ছোট ফাটলগুলোর একটা। তবু এটা সর্বোচ্চ ৭.৮ – ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে দেশের ভেতরে ও আশেপাশে বড় বড় ফাটল রয়েছে সম্প্রতি ছোট ছোট ভূমিকম্পের সংখ্যা বড় আকারের ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে।
২১ সেপ্টেম্বর সিলেটে অনুভূত ৪ মাত্রার ভূমিকম্প আশপাশের এলাকায়ও তীব্র কম্পন সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ও হালকা এসব ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১২৬টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল দেশীয়। ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছর ছয়টি ভূমিকম্প ঘটেছে।সবচেয়ে বেশি উৎপত্তিস্থল সিলেটের—সেখানে আটটি ভূমিকম্প হয়েছে। এছাড়া দিনাজপুর ও রংপুরে দুটি করে, পাবনা, কুমিল্লা, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, রাঙ্গামাটি ও চুয়াডাঙ্গায় একটি করে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি হয়েছিল শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় রিখটার স্কেলে যার পরিমাপ ছিল ৪.১। সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ, বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চল বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল ও সক্রিয় ফল্ট রয়েছে, যা ভূমিকম্প সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসাইন ভূইয়া বলেন, বাংলাদেশের ভূগঠন নরম শিলায় তৈরি হওয়ায় নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সি ও উচ্চ অ্যাম্পলিচিউডের ভূমিকম্প ক্ষতি বেশি করতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ছোট ভূমিকম্প সাধারণ হলেও বড় বিপর্যয় এড়াতে সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতি জরুরি। সঠিক বিল্ডিং কোড মানা, খালি জায়গা রাখা, উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা ও প্রশিক্ষিত জনবল থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ । এবার যে ভূমিকম্প হলো, সেটি হয়েছে ‘ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনের’ মধ্যে। সাবডাকশন জোন হলো এমন একটি এলাকা, যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ হয় এবং একটির নিচে অন্যটি তলিয়ে যায়। এই ‘ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনের’ বিস্তৃতি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা পর্যন্ত। এটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।
এই ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনের আবার কয়েকটি ভাগ আছে। এর একটি হলো লকড জোন, আরেকটি হলো স্লো-স্লিপ জোন। লকড জোনে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়ে থাকে। এটা বাংলাদেশের পূর্ব প্রান্তে বা সাবডাকশন জোনের পশ্চিমে অবস্থিত। এই দুই সাব–জোনের বাইরে ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনের মধ্যেই আছে সাগাইং ফল্ট। এটি শান মালভূমি ও সেন্ট্রাল মিয়ানমার বেসিনের সংযোগ এলাকা। সেখানেই এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ। কিন্তু এর কিছু ভিন্ন ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আছে। আমাদের ভূমিকম্পের উৎস দুটি। একটি হলো ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনে, যেটি বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত। আরেকটি উত্তরে ডাউকি চ্যুতি এবং হিমালয়ের পাদদেশ এলাকায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো সাবডাকশন জোন। এই সাবডাকশন জোনের লকড এরিয়া বলতে যে অঞ্চলকে বোঝায়, সেটি সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ-মেঘনা নদী থেকে পূর্বে ভারতের মণিপুর-মিজোরাম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানেই দুটি প্লেট একটি অন্যটির সঙ্গে আটকে আছে। নিচে ভারতীয় প্লেট আর ওপরে বার্মা প্লেট। এই আটকে থাকার কারণ হলো এখানে ফ্রিকশন এনার্জি বা ঘর্ষণশক্তি অনেক বেশি। আমাদের এখানে যে লকড জোন, সেখানে এই ঘর্ষণশক্তির পরিমাণ অনেক বেশি। এ কারণে আমাদের এখানে ভূমিকম্প কম হয় কিন্তু এটা আবার আমাদের জন্য বিপজ্জনক। এখানে ৮০০ থেকে ১০০০ বছর আগে বড় ভূমিকম্প হয়ে যে শক্তি ছেড়ে বের হয়ে গেছে, সেখানে নতুন করে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। এখানে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে।
ডিসিএন বাংলা টিভি/