ডিসিএন বাংলা টিভি নিজস্ব প্রতিবেদন।
হাসান কাজল :
স্মার্ট ফোনের আশক্তি সর্বনাশা নেশা মাদকের চাইতে ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রিয় জীবনে। এই মরণনেশা সবচাইতে বেশি প্রভাব ফেলছে নারী ও শিশুদের জীবনে। ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের মতো নেশাসক্ত হয়ে পরকীয়ায় জড়িয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার সংসার ভাঙ্গছে । অর্থনীতি ধ্বংসের পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়েছে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাও। আর শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আবার বাসা বেঁধেছে নতুন এক উপদ্রব মোবাইল ফোন আসক্তি। অনলাইন ভিত্তিক ক্লাসের নামে অভিভাবকদের তাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের হাতে মরণ নেশা তুলে দিতে হচ্ছে। এ নেশায় আসক্ত হয়ে কিশোর-কিশোরীরা লেখাপড়ার নামে দারুণভাবে ঝুঁকে পড়ছে মোবাইলের বিভিন্ন অ্যাপসভিত্তিক গেমস, পর্নোগ্রাফি ভিডিও, পাবজি, ফ্রি-ফায়ারের মতো মরণঘাতি গেমসের নেশাসহ ইউটিউব, লাইকি, ফেসবুক, টুইটারসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি।
এ যন্ত্রটি এমন একটি নেশা, যার প্রভাবে খুন,ধর্ষণ সহ সংসারে অশান্তি তৈরি হচ্ছে। গড়ে উঠছে দেশের বিভিন্ন জায়গার কিশোরগ্যাং। বিবাহিতদের মাঝে বাড়ছে ডিভোর্সের প্রবণতা। তা ছাড়া এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ মোবাইল আসক্তির কারণে স্কুল-কলেজের তরুণ-তরুণীরা চরম মানসিক অস্থিরতায় ভুগছে। ৫০থেকে ৬০ শতাংশ তরুণ-তরুণী দিনে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় করে। ৩০ থেকে ৪০ শতাংশরা দিনে চার থেকে ছয় ঘণ্টা এবং ৩১ শতাংশ দুই থেকে চার ঘণ্টা দৈনিক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় দিয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে যৌথ পরিবার কাঠামো ভেঙে একক পরিবার তৈরি হওয়ার কারণে আরো বেশি পরিমাণে ছেলেমেয়েরা এই মোবাইলের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন গবেষকরা। মোবাইল আসক্তির ভয়াবহ এ প্রবণতায় বিশেষ করে উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েরা বর্তমান পরিস্থিতিতে এক বিরাট সংকটকাল অতিক্রম করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষকরা মোবাইল ফোনের সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর এই ভয়জনিত অসুখের নাম দিয়েছেন ‘নোমোফোবিয়া’। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ৫৩ শতাংশ এবং ২৯ শতাংশ ভারতীয় তরুণরা এ রোগের শিকার।
অপরদিকে যুক্তরাজ্যের গবেষক বলেছে, মোবাইল অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে চোখের জ্যোতি আনুপাতিক হারে কমে যাবে, এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের চক্ষুবিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে দৃষ্টিশক্তি কমে যাবে। কানে কম শুনবে, আর এ বিষয়টি নির্ভর করবে মোবাইল ব্যবহারকারীর ওপর। কারণ সে কানের কতটুকু কাছাকাছি এটি ব্যবহার করে, উচ্চ শব্দে গান শুনে কি না। এ ছাড়াও শারীরিক বিভিন্ন অসংগতি দেখা দেবে। যেমন শরীরের অস্থিসন্ধিগুলোর ক্ষতি হতে পারে। কমে যেতে পারে শুক্রাণু। গবেষকরা জানান, মোবাইল ফোন থেকে হাই ফ্রিকোয়েন্সির ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন নির্গত হয়। এই ক্ষতিকর তরঙ্গের সঙ্গে মস্তিষ্কে ক্যানসারের যোগসূত্র থাকতে পারে। এ ছাড়া শরীরের অন্য কোষকলা এই ক্ষতিকর তরঙ্গের প্রভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে পুরুষের প্রজননতন্ত্রেরও।
শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে একজন মানুষের প্রতিদিন ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। ঘুমের সময়টা স্মার্ট ফোন দখল করে নেয়ায় ঘুমের সমস্যা প্রবল হয়ে ওঠে। ইনসমনিয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়। ইনসমনিয়া বা স্পিং ডিসঅর্ডার বলতে অনিদ্রা বা স্বল্প নিদ্রাকে বোঝায়। এর ফলে মানুষের শরীরে ঘুমের চাহিদা অপূর্ণ থেকে যায়। ইনসমনিয়ার দুই ধরন প্রাথমিক বা স্বল্পমেয়াদি- এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ব্যক্তির ঘুমাতে সমস্যা হয় কিন্তু তা শারীরিকভাবে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। স্বল্পমেয়াদি ইনসমনিয়া কিছুদিন অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। অপরটি ক্রমিক বা দীর্ঘমেয়াদি।
অনিদ্রা যখন এক মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, তখন তাকে দীর্ঘমেয়াদি ইনসমনিয়া বলে। এ ধরনের ইনসমনিয়ার কারণ শারীরিক ও মানসিক অবসাদ, অ্যাজমা, আর্থ্রাইটিস, অ্যালকোহল সেবন, ওষুধের কুফল ইত্যাদি। ইনসমনিয়া নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা কিছু নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করেছেন। এরমধ্যে অন্যতম কারণ হলো মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার। বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বললেই সবার আগে যে প্রযুক্তির কথা আমাদের মাথায় আসে তা হলো স্মার্টফোন।
অভিজ্ঞ জনেরা বলেন,যোগাযোগ মাধ্যমের সর্বাধুনিক সহজ প্রযুক্তি হচ্ছে মোবাইল ফোন। এর বিকল্প এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার এড়িয়ে চলবার উপায়ও নেই। তাই এর ব্যবহার অনিবার্য। তবে অপব্যবহার যেন না হয়, দিনকে দিন যাতে ছেলেমেয়েরা এর প্রতি আসক্তি বা ঝুঁকে না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়া খুবই জরুরি। এর ভয়াবহতা বা আসক্তি থেকে ছেলেমেয়েদের দূরে রাখতে হলে তাদের হতে তুলে দিতে হবে আকর্ষণীয় বই, পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন ধরনের ম্যাগাজিন। যোগাযোগ ঘটাতে হবে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। বিনা প্রয়োজনে এর অতিরিক্ত ব্যবহার পরিহার করা বুদ্ধিমানের কাজ। তাই যাতে আমাদের তরুণ সমাজ এর ভয়াবহতায় ধ্বংস না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা অভিভাবকদের জন্য অতীব জরুরি। আমাদের পরবর্তী জেনারেশনকে এ ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে সচেতন হতে হবে অভিভাবকদের। প্রতিরোধের ব্যবস্থাও নিতে হবে সচেতনভাবে- যাতে করে এর প্রভাবে আবার কোনো দুর্ঘটনা না পড়ে উঠতি বয়সের আবেগ প্রবণ ছেলেমেয়েরা।
স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেশায় এখন সবাই যেন পাগলপ্রায়।র্ এই অবস্থাতেই তারা মোবাইলের প্রতি এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যে তার কুপ্রভাব পড়ছে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর।স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেশার সঙ্গে অন্যান্য নেশার অনেক মিল আছে। দুই বিষয়কেই আচরণগত আসক্তি বলা হয়। কিন্তু অন্যান্য নেশা ছাড়া যতটা সহজ, অনলাইনের অভ্যেস ছাড়া তার চাইতে অনেক বেশিকঠিন।তবে প্রাত্যহিক কিছু চর্চার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এই স্মার্টফোনে আসক্তি কমিয়ে আনা সম্ভব।
মোবাইল আসক্তি হলো মোবাইল ফোনের উপর মনস্তাত্ত্বিক বা আচরণগত নির্ভরতা, যেখানে ব্যক্তি অত্যধিক সময় ও অর্থ ব্যয় করে এবং সামাজিক বা শারীরিক অনুপযুক্ত পরিস্থিতিতেও মোবাইল ব্যবহার করে। এর ফলে চোখের ক্লান্তি, মাথাব্যথা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডে ব্যথা এবং মনোযোগের ক্ষমতা হ্রাস সহ শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে হবে স্মার্টফোনের নেশা হয়ে গেছে। যেমন বাথরুমেও স্মার্টফোন ব্যবহার করা। কিছুক্ষণের জন্য সঙ্গে স্মার্টফোন না থাকলে আতঙ্কিত হয়ে পড়া ।স্মার্টফোন অতিরিক্ত ব্যবহার করার কারণে বেশিক্ষণ চার্জ না থাকা ।অন্যান্য খরচ কমিয়ে স্মার্টফোনের বিল পরিশোধের জন্য অর্থ সঞ্চয় করা ।স্মার্টফোনে বেশি অ্যাপ থাকা ।স্মার্টফোনে অ্যালার্ম বা রিমাইন্ডার উপর নির্ভর করা ।অত্যধিক গেম আসক্তি, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভিডিও দেখা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় মনোযোগ বেশি দিতে গিয়ে মাথা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঝুঁকে থাকার কারণে ঘাড়ে ব্যাথা দেখা দেয়।দীর্ঘ সময় চোখের খুব কাছে রেখে মোবাইল ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হওয়ার সমস্যা দেখা দেয় । মোবাইলের নীলাভ আলো চোখের রেটিনার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মাধ্যমে অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ মহলের বলেন, মোবাইলে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা, উচ্চ আওয়াজে গান শোনা এবং কানে হেডফোন গুঁজে রাখার মাধ্যমে দেখা দিতে পারে শ্রবণশক্তি হ্রাস হওয়ার মতো গুরুতর সমস্যা। কানে হেডফোন লাগিয়ে যত্রতত্র চলাফেরায় প্রতিনিয়ত অনেক দূর্ঘটনা ঘটে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে টাইপিংয়ের ফলে আঙুলের জয়েন্টে ব্যাথা হয়।এমনকি এর ফলে আর্থরাইটিসের সমস্যা হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া বসার ভঙ্গি এবং কাঁধ ও কানের মাঝামাঝি ফোন রেখে কথা বলার কারণে বিভিন্ন ধরনের শারিরীক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে মনের মধ্যে সব সময় মোবাইল আছে কিনা, নাকি হারিয়ে গেলো এমন একটা ভয় তৈরি হয়। এই রোগের নাম নোমোফোবিয়া তথা নো মোবাইল ফোন ফোবিয়া। এছাড়াও মোবাইলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয় ।দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে অনেক সময় ব্যবহারকারীর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। একই সাথে অস্থিরতা ও অমনোযোগীতা বৃদ্ধি পায়। সাধারণত তখন ব্যবহারকারী নিজের অজান্তেই কারো সাথে অশোভন আচরণ করে ফেলেন। মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মানুষের তড়িৎ চিন্তাশক্তি কমে যায়। সৃজনশীল মেধা কমে যাওয়ার ফলে কোন কিছুর উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা বিনষ্ট হয়ে যায়। তাই অভিজ্ঞ মহলের পরামর্শ প্রয়োজনীয় কথাবার্তার বাইরে স্মার্টফোনে সামাজিক যোগাযোগের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় বরাদ্ধ রাখুন । ধরা যাক, রাতের খাবারের পর ১৫ মিনিট।বাড়িতে কিছু ‘স্ক্রিন-মুক্ত এলাকা’ তৈরি করুন , যেখানে কেউই স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট ইত্যাদি নিয়ে মেতে থাকতে পারবেন না।স্মার্টফোনে ব্যয় করার সময়টুকু পরিবারের সঙ্গে কাটান ।যেসব কাজ শিগগিরই শেষ করতে হবে, তার একটা তালিকা স্মার্টফোনের সঙ্গে রেখে দিন, যাতে ফোন তুলতে গেলেই ওই কাজের তালিকায় চোখ যায়। অনলাইনে শেয়ার করতে হবে এমন লেখালেখিগুলো অফলাইন থাকা অবস্থাতেই শেষ করে নিন। অপ্রয়োজনীয় সব নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখুন।নির্দিষ্ট কাজের সময়গুলোর জন্য টাইমার সেট করে রেখে বিরক্তিকর অ্যাপসগুলোর অ্যাকসেস ও নোটিফিকেশন অফ করে রাখুন।‘মোমেন্ট’-এর মতো কোনো একটা অ্যাপস ডাউনলোড করে নিন, যা আপনাকে দিনে কতবার ফোন তুলে নিচ্ছেন তা মনে করিয়ে দেবে এবং আপনাকে এই কাজে নিরুৎসাহিত করবে। আপনাকে একঘেয়ে লাগা ও ভালো না লাগার মতো অনুভূতিগুলোর সঙ্গেও কিছুটা সময় মানিয়ে চলতে শিখতে হবে, এসবে অভ্যস্ত হতে হবে।
www.dcnbangla.tv