হাসান কাজল : আলোকচিত্রী শহিদুল আলমসহ অনেক যাত্রীকে বহনকারী গাজা অভিমুখী জাহাজ কনশেনস আটক করেছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নৌযান ও যাত্রীদের ইসরায়েলি বন্দরে নেওয়া হচ্ছে। ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন জানিয়েছে, গাজামুখী তাদের নৌ-বহরে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। একই সঙ্গে কয়েকটি জাহাজও আটক করেছে তারা। বাংলাদেশের আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ‘কনশেনস’ নামের যে জাহাজটিতে ছিলেন, সেটিতেই প্রথম হামলা চালানো হয়।
ওই জাহাজটিতে ৯৩ জন সাংবাদিক, চিকিৎসক ও সমাজকর্মী ছিলেন। এর পরে আরও তিনটি ছোট নৌযানে হামলা চালিয়ে সেগুলোও আটক করে ইসরাইলি বাহিনী।এদিকে, ফ্রিডম ফ্লোটিলার ওপর হামলা ও আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক্স হ্যান্ডেলে দেওয়া এক পোস্টে তারা জানিয়েছে, আইনগতভাবে নৌ-অবরোধ লঙ্ঘন ও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশের আরেকটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, জাহাজ ও আটক যাত্রীদের ইসরাইলের একটি বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সবাই নিরাপদ ও সুস্থ আছে। তাদের দ্রুতই দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক থেকে এক ভিডিও বার্তায় আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, ‘আমি শহিদুল আলম, বাংলাদেশের একজন আলোকচিত্রী ও লেখক। আপনি যদি এই ভিডিওটি দেখে থাকেন, তাহলে এতক্ষণে আমাদের সমুদ্রে আটক করা হয়েছে। আমাকে ইসরাইলের দখলদার বাহিনী অপহরণ করেছে। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সক্রিয় সহযোগিতা এবং সহায়তায় গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার সকল কমরেড এবং বন্ধুদের কাছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’এর আগে, গতকালমঙ্গলবার ৭ অক্টোবর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, বুধবার ভোর নাগাদ ‘রেড জোন’ তথা বিপজ্জনক অঞ্চলে পৌঁছে যেতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের আলোচিত ঘটনা ” গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা” এযেন শোষক আর শোষিতের লড়াই। হত্যা, ধ্বংস, নারকীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানবতার লড়াই। বুলেট -বোমা বারুদের বিরুদ্ধে শান্তি আর মানবাধিকারের লড়াই।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার শেষ জাহাজ ‘দ্য মেরিনেট’ ভূমধ্যসাগরে ভাসছে, ধীরে ধীরে গাজার কাছাকাছি এগিয়ে যাচ্ছিল। গাজার জলসীমায় প্রবেশের পর ৪৪টি জাহাজ ও তার যাত্রীরা ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। গাজার অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল ‘দ্য মেরিনেট’। কিন্তু সেটির পরিণতিও অন্য জাহাজগুলোর মতো হয়।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা নৌবহর যাত্রা করে গাজার ১৭ বছরের অবরোধ ভাঙতে খাদ্য, ওষুধ আর শিশুদের খেলনা নিয়ে। ইসরায়েলি নৌবাহিনীর হাতে আটক দুই শতাধিক অ্যাকটিভিস্ট, যাঁদের মধ্যে আছেন সুইডিশ জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মী, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও সাংবাদিকেরা।
এ ঘটনা আবার ২০১০ সালের মাভি মারমারার রক্তাক্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। যে হামলায় ৯ জন তুর্কি নাগরিক ইসরায়েলি কমান্ডোদের হাতে নিহত হন। তবু ফ্লোটিলার যাত্রা থামেনি। কেননা আয়োজকদের মতে, এই অবরোধ শুধু গাজাকে নয়, মানবতাকেও বন্দী করেছে। তাই ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’ কে বলা হয় একটি কোয়ালিশনের অংশ, যা ২০০৮ সাল থেকে গাজার অবরোধ ভাঙার জন্য লড়ছে। ২০১০ সালে মাভি মারমারা তুরস্ক থেকে ত্রাণ নিয়ে যাত্রা করলে ইসরায়েলি বাহিনী নৃশংস হামলা চালায়। হামলায় ৯ জন তুর্কি নাগরিক নিহত ও ডজনখানেক আহত হন।
ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, জাতিসংঘ অবরোধের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এর পর থেকে ২০১১, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৮ ও ২০২৫ সালের উদ্যোগগুলো সবই ইসরায়েলি বাহিনী দ্বারা বাধাগ্রস্ত, হামলার শিকার বা দখল করা হয়।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত মাঝেমধ্যে সাইপ্রাস ও গাজার মধ্যে একটি সমুদ্র করিডর খোলা হয়েছিল সাহায্য পৌঁছানোর জন্য। ২০২৫ সালের মার্চে ইসরায়েল তিন মাসের জন্য গাজায় পূর্ণ অবরোধ ঘোষণা করে, যেখানে কোনো সরবরাহ ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
সুমুদ ফ্লোটিলা ২০২৫ সালের আগস্টের শেষ দিকে ওত্রান্তো, জেনোয়া ও বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করে। গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে কাতানিয়া, সিরোস ও তিউনিস থেকেও বহর রওনা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর ইতালীয় বহর সিসিলিতে পৌঁছায় ও তিউনিসিয়ার জাহাজগুলো তিউনিসে একত্র হয়। চার দিন পর স্প্যানিশ বহরের একটি অংশ উত্তর তিউনিসিয়ায় পৌঁছায়, যেখানে ৯ সেপ্টেম্বর ভোরে একটি প্রধান জাহাজে আগুন ধরে যায়, যা ড্রোন হামলা বলে সন্দেহ করা হয়। পরের রাতেই আরেকটি জাহাজে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
১৯ সেপ্টেম্বর স্প্যানিশ ও তিউনিসিয়ান বহর একত্র হয়ে সিসিলি থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। ২২ সেপ্টেম্বর গ্রিক বহর মিলোস থেকে ক্রিটের উদ্দেশে যাত্রা করে এবং পরদিন সেখানে পৌঁছায়। ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে ১১টি জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ক্রিটে বহরগুলো একত্র হয়ে গাজার দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখে।এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন এক ডজনেরও বেশি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ, ইতালির রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দল, স্পেন ও পর্তুগালের সংসদ সদস্যরা, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেসকা আলবানেস।
এর বিপরীতে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির দাবি করেন অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে কারারুদ্ধ করা উচিত। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ফ্লোটিলা থামানোর অঙ্গীকার করে।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত মাঝেমধ্যে সাইপ্রাস ও গাজার মধ্যে একটি সমুদ্র করিডর খোলা হয়েছিল সাহায্য পৌঁছানোর জন্য। ২০২৫ সালের মার্চে ইসরায়েল তিন মাসের জন্য গাজায় পূর্ণ অবরোধ ঘোষণা করে, যেখানে কোনো সরবরাহ ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এ সময়ে মে মাসে একটি গাজার এক মৎস্যজীবী নারীর নামে নামকরণ করা ‘মাদলিন’ ফ্লোটিলা ড্রোন হামলার শিকার হয়, আর জুন ও জুলাইয়ে অন্য বহরগুলো ইসরায়েলি বাহিনী আটক করে।
একত্র হয়ে সিসিলি থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। ২২ সেপ্টেম্বর গ্রিক বহর মিলোস থেকে ক্রিটের উদ্দেশে যাত্রা করে এবং পরদিন সেখানে পৌঁছায়। ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে ১১টি জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ক্রিটে বহরগুলো একত্র হয়ে গাজার দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখে। আয়া আল-গুসাইন, ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এই জাহাজ আমাদের আশা। আমরা অবরোধে মরছি, এরা আমাদের বাঁচাতে এসেছে।’ প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের মধ্যে উৎসাহের ঢেউ। তুরস্কের বন্দরে তারা জড়ো হয়ে ফ্লোটিলার জন্য দোয়া করছেন।
একজন বাঙ্গালী এই মিশনে অংশ নিয়ে বিশ্ব কাপিয়েছেন জগৎ বিখ্যাত ফটোগ্রাফার শহিদুল আলম। ফিলিস্তিনের প্রতি তার সমর্থনও পুরোনো। ২০১০ সালের ফ্লোটিলায় হামলার পর তিনি লন্ডনের ‘প্যালেস্টাইন সলিডারিটি’ ক্যাম্পেইনে যোগ দেন। তাঁর ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী ‘ক্রসফায়ার’ গাজার ধ্বংসলীলা তুলে ধরেছে। ২০১৪ সালে ফিলিস্তিনি ফটোগ্রাফার তামাম আল-আক্কালের সঙ্গে তিনি কাজ করেন, যিনি গাজার শিশুদের গল্প ছবিতে ধরেন। শহীদুল বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাকে শিখিয়েছে, সংগ্রামে একা থাকা যায় না। ফিলিস্তিন আমার লড়াইয়ের অংশ।’
এই ফ্লোটিলায় তিনি বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে গেছেন, জুলাইয়ের অগ্রণী শহীদ আবু সাঈদের প্রতিকৃতি অঙ্কিত টি–শার্ট গায়ে দিয়ে শুধু যে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন তা নয়; বরং এ দেশের বিপুল মানুষের কাছে ফিলিস্তিনের স্বপ্ন নতুন করে জাগিয়ে তুলেছেন। ঢাকার প্যালেস্টাইন অ্যাম্বাসি তাঁর এই যাত্রাকে ‘বাংলাদেশের গর্ব’ বলেছে।
গাজার একজন মা, উম্মে আহমেদ, সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘আমার সন্তানেরা খিদেয় কাঁদছে। এই জাহাজ আমাদের জন্য যেন বাঁচার আশা হয়।’
বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়া শহীদুল আলম শুধু একজন প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার নন, নাগরিক প্রতিনিধি ও মানবাধিকারকর্মী হিসেবে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলে তিনি ১০১ দিন কারাবাস করেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশি নির্যাতনের মুখেও তিনি রাস্তায় ছিলেন।
এই আটকের প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বার্তা দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।৮ অক্টোবর দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে তিনি শহিদুল আলমের বিষয়ে বার্তা দেন।পোস্টে মির্জা ফখরুল লিখেছেন, আমি সরকারকে শহিদুল আলমের নিরাপদে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফ্লোটিলায় থাকা মালয়েশীয় কর্মীদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
ডিসিএন বাংলা/আ.নি.