ইকবাল হাসান কাজলঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, এসব অনেকেই জোরসে বলে ফেলে। বাস্তবিক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি? প্রশ্নটা হলো নিজেদের আখের গোছানো, লুটপাট,ভোটাধিকার, গণতন্ত্র হত্যা, গণহত্যা, খুন,গুম,ধর্ষণ, নাগরিক অধিকার হরণ এমন কি দেশের স্বাধীনতা -সার্বভৌমত্ব বিক্রি করা মানুষেরা তাদের অপকর্মে জায়েজ করতে অহর্নিশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চেতনা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে।
চেতনার শ্লোগান ধরা মানুষদের উদ্দেশ্যে দেশের মানুুষকে অন্যায়ভাবে শাসন,, শোষন করে সীমানার ওপারে দেশ বিক্রী করে দেয়া।মুক্তযুদ্ধের চেতনার মৌলনীতি ৪টি : জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল নীতি এর মাঝেই বিদ্যমান। কোন ব্যক্তি দল কিংবা গোষ্ঠীর চর্চার মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিদ্যমান নয়। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মুক্তির সোপান তলে চিৎকার করে আপন অধিকার আদায়ের সংগ্রামই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।মুক্তবুদ্ধি’র চর্চা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার লড়াই সংগ্রামের নাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। লাল সবুজের পতাকা,একটি মানচিত্র, বা্ঙ্গালী কিংবা বাংলাদেশী জাতিসত্বার প্রকাশ একটি সশস্ত্র যুদ্ধ, মুক্তির সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ইস্পাত দৃঢ় লৌহ কঠিন শপথের বাণী, মা মাটি মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল চেতনায় অবিনশ্বর।
অশুভ ক্ষমতার অন্ধ মোহে মানুষ -মানবতাকে ভুলুন্ঠিত করা কখনোই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল না!স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা, শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন , হামলা, মামলা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, সত্য কে মিথ্যার আবরণে ঢেকে দেওয়া কখনোই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়। ত্রিশ লক্ষ শহীদের শহীদের পবিত্র রক্ত রাঙা , দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত, স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। সেই পবিত্র আলোর মশালে কলঙ্কের কালিমা লেপন করতে করতে ওরা কারা? সমাজের সচেতন অংশের নেতৃত্বের জায়গায় বসে, ব্যাক্তি, দল,গোষ্ঠীর চাটুকারিতা করছেন!
শোষণ, নির্যাতন, অপশাসন কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে চালানোর অপচষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। কি অবলীলায় বলে দিলেন,আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ! তার পক্ষে যুক্তি হলো আপনারা একজন অনির্বাচিত স্বৈরশাসকের অনুসারী, আপনারা ব্যাক্তি, দল ও গোষ্ঠীর দোহাই দিয়ে চেতনা বাজ।চমৎকার দেশ,জাতি, সমাজের বিবেকের নেতৃত্বে বসে পুরো জাতিকে বিভৎস অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া একদল নষ্ট মানুষের প্রতিচ্ছবি। সাংবাদিক যদি সমাজের আয়না হয় তাহলে সেই আয়নায় কি দেখা যায়? সাংবাদিকদের নেতৃত্ব দেওয়া মানুষদের মুখে,মুক্তিযুদ্ধের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যাখ্যা শুনে বেহুশ হওয়ার অবস্থা! যে সময়ে দেশে সাংবাদিকদের সকল অধিকার হরণ করা হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে সাংবাদিকদের বুকে মুখে পেরেকঠোকা হয়েছে। গণমাধ্যম কর্মী আইন দিয়ে পেশাকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে! পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিদিন প্রতিদিন, সন্ত্রাসী,হামলা, মামলা, গ্রেফতার হচ্ছে সাংবাদিক। প্রকাশ্যে গুলি হত্যা করা হচ্ছে কর্তব্যরত সাংবাদিকদের। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় খুন, অপহরণ, হামলা,মামলার শিকার হচ্ছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর রুনি হত্যার বিচার দুরের কথা আজও তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে পারেনি, তদন্তে নিয়োজিত সংস্থা। যুগযুগ ধরে সাংবাদিকদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। কর্মসংস্থান নেই, চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে তারা। বেতন ভাতা নেই, কথায় কথায় অন্যায় ভাবে চাকুরী চ্যুত করা হয়।
সাংবাদিক দের দের জন্য রেশন নেই, নেই কোন দায়িত্ব। ওনারা সাংবাদিক নেতা হয়ে, ভুয়া চেতনার দোহাই দিয়ে হালুয়া রুটি খায়। অবৈধ ক্ষমতার ভাগ নিয়ে বাড়ি গাড়ি করে। তারা অনেকেই হাজার কোটি টাকার মালিক। ওরা দলবাজ,এরা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে। সাংবাদিকতা পেশাকে তারা সরকার ও বিরোধী দলের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত করেছে। যে কারণে পেশা আজ ধ্বংসের মুখে। অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে এই পেশার মানুষেরা।
অনেকেই করোনা ও ঘৃণার চোখে তাকায় সাংবাদিকদের দিকে। যেই সাংবাদিক সমাজ খেয়ে না খেয়ে, জীবন বাজী রেখে সংসারের মায়া ত্যাগ করে মানুষ ও মানবতার সেবায় কাজ করে। তারা অপরাজনীতির শিকার হয়ে রাষ্ট্রের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত। সাংবাদিকতাকে সংবিধানে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। এটা শুধু সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ। স্বাধীনতার অর্ধশতক পার হলে আইনি কাঠামোর আওতায় পেশাকে তার অধিকার মর্যাদা দেওয়া হয়নি! এই পেশার নেই কোন সীমারেখা। নেই কোন অধিকার। বিরোধীদল তাদের অধিকার আদায়ের সময় খুঁজে সাংবাদিক দের। প্রশ্ন তোলে নীতি নৈতিকতা, পেশাদারিত্বের।ক্ষমতায় এসেই দমন-পীড়ন চালায়।
অধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজে লিপ্ত হয়। যুগযুগ ধরে অধিকার বঞ্চিত সাংবাদিকদের নেতৃত্ব দেয় কার?এই সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরল অর্থ জানেন কি? দেশ জাতি র ক্রান্তিলগ্নে সাংবাদিক সমাজের ভুমিকা সবচেয়ে বেশি। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, মানবতা,মানবাধিকার, সৌহার্দ্দ, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অতন্দ্র প্রহরী সাংবাদিক। আইনের শাসন, আইনশৃঙ্খলা, ন্যায় বিচার, নাগরিক অধিকার, সামাজিক ন্যায্যের পক্ষে, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, ঘোষ,খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মাদক সিন্ডিকেট, অবৈধ অস্ত্রবাজদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের অবস্থান। তাই মুক্তিযুদ্ধের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তবুদ্ধি’র চর্চার কথা বলতে হলে জানতে হবে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, মূলনীতিও তার অবস্থান : ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে এই উপমহাদেশের মুক্তিলাভ হলেও বাঙালি জাতির প্রকৃত মুক্তি আসেনি। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের শােষণ ও শৃঙ্খলের জটিল জালে বন্দি হয় বাঙালি জাতি।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয়দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালি জাতি শােষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির প্রত্যাশা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়।
ডিসিএন বাংলা/জা.নি.