হাসান কাজল: নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র চোরাচালান বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরও থামছে না অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ও ব্যবহার।।সম্প্রতি দেশে উদ্বেগজনকভাবে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার বেড়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি চক্র দেশের পশ্চিম, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরে রাজশাহী সীমান্তের পাশাপাশি ছোট সীমান্ত দিয়েও নানা ধরনের অস্ত্র নিয়ে আসছে সীমান্তের ওপার থেকে। পাচার করে আনার সময় কিছু অস্ত্র বিজিবি বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে জব্দ হলেও এর কয়েক গুণ বেশি ঢুকে যাচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য মতে, কক্সবাজার,পার্বত্য চটৃগ্রাম সহ অরক্ষিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম বাইশফাড়ি, বালুখালী, উখিয়ার পালংখালী, হোয়াইক্যং নলবনিয়া ও নাইক্ষ্যছড়ির বেশ কয়েকটি রুট দিয়েও আসছে আগ্নেয়াস্ত্র। আরাকানের অস্ত্র ঢুকছে খাদ্যপণ্য ও অর্থের বিনিময়ে। এ ছাড়া অস্ত্র বেচাকেনায় সক্রিয় আছে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক সন্ত্রাসীরাও। সন্ত্রাসীরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে পিস্তল, রিভলবার ও চায়না রাইফেল। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে, শুধু বিদেশি নয়, দেশীয় তৈরি অস্ত্রও ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা। ইতোমধ্যে এমন অনেক অস্ত্র উদ্ধারও হয়েছে। যেগুলো তৈরি হয় বাঁশখালি, রাঙ্গুনিয়া, কক্সবাজার, মহেশখালীর পাহাড়ে। একটি বিশেষ সূত্রে প্রকাশ,দেশীয় অস্ত্রগুলো তৈরি করতে তাদের বড় কারখানার প্রয়োজন হয় না। ছোট ছোট কারখানায় তারা এসব অস্ত্র তৈরি করে ফেলে। নির্বাচন সামনে রেখে অস্ত্রের কারবার বা ব্যবহার বাড়তে পারে- এমন শঙ্কা থাকায় অস্ত্র চোরাচালান ও বেচাকেনায় জড়িতদের চিহ্নিত করার কথা বলছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। নির্বাচনের আগে এসএমজির মতো এমন প্রাণঘাতী অস্ত্রসহ রাইফেল, মর্টার শেল, পিস্তল, গুলি ও ভয়ংকর বিস্ফোরক চোরাচালানের মাধ্যমে সীমান্তপথে দেশে আসছে। এর কিছু অংশ ধরা পড়লেও বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। অন্যদিকে আকর্ষণীয় পুরস্কার ঘোষণা করেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদের মধ্যে এখনো ২৫ শতাংশ উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ- বিজিবির হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে পাচারের সময় দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মোট ১ হাজার ২২৫টি অস্ত্র, গুলি ও ম্যাগাজিন জব্দ করা হয়। এর মধ্যে গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে জব্দ হয়েছে ৯৭টি। বাকি ১ হাজার ১২৮টি গত মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ পাঁচ মাসে জব্দ করা হয়। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র চোলাচালান বাড়ছে। এ সময় জব্দ হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে দুটি এসএমজি। এছাড়া রয়েছে তিনটি মর্টার শেল, ১১টি রিভলবার, ১৯টি পিস্তল ও পাঁচটি শটগান। প্রাণঘাতী এসব অস্ত্র ছাড়াও এ বছরের প্রথম নয় মাসে সীমান্তে মোট ১ হাজার ১০৮ রাউন্ড বিভিন্ন ধরনের গুলি জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩১ রাউন্ডই হয়েছে মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এছাড়া এ সময় ৩১টি ম্যাগাজিনও জব্দ হয়েছে সীমান্ত এলাকা থেকে। পাশাপাশি এ সময় দেশী পিস্তল, রাইফেলসহ অন্য আরো বেশকিছু অস্ত্র চোরাচালানের সময় সীমান্তে জব্দ হয়।
সীমান্তে জব্দ হওয়া অস্ত্রের কয়েক গুণ বেশি অস্ত্র দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অস্ত্রের চোরাচালানে জড়িত সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারি চক্র দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অশান্ত করতে বিভিন্ন সীমান্তে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান পরবর্তী সময়ে এসব অস্ত্র সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হাতে যায়। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এসব অবৈধ অস্ত্রের জোগানও দেশে বাড়তে শুরু করেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী অস্ত্রের বড় চালানগুলো দেশে ঢোকে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে। এছাড়া যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, দর্শনা, শাহজাদপুর, হিজলা, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা, বেনাপোল সীমান্তের গোগা, কায়বা, শিকারপুর, দৌলতপুর, দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকছে। সীমান্ত এলাকার ঘাটমালিকরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ঘাট চালান। সাধারণ অস্ত্রের পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্রও তাদের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করানো হয়। বিষয়টি আলোচনায় আসে ২০১৬ সালে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর। ওই হামলার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে আমের ঝুড়িতে করে আনা হয় একে-২২ রাইফেল। যশোরের চৌগাছা সীমান্ত দিয়ে আনা হয় বোমা। আর পার্শ্ববর্তী দুই দেশ থেকে বাংলাদেশে আসা বেশির ভাগ অস্ত্র তৈরি হয় ওই দেশগুলোতেই। বিশেষ করে ভারতের বিহার রাজ্যের রাজধানী পাটনা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বের শহর মুঙ্গেরে তৈরি হয় এসব অস্ত্র। এর আগে পাচারের সময় প্রায় অর্ধশত একে-৪৭ জব্দ করে ভারতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মুঙ্গেরের চুরওয়া, মস্তকপুর, বরহদ, নয়াগাঁও, তৌফির দিয়ারা, শাদিপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে।
রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত পথে আসছে অবৈধ অস্ত্রের চালান। ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এসব অস্ত্রের চালান জাতীয় জীবনে গভীর শঙ্কা ছায়া ফেলছে। সম্প্রতি রাজধানীতে সেনাবাহিনী একটি বড় অস্ত্রের চালান জব্দ করেছে। একই সঙ্গে পদ্মার চরে সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানেও উদ্ধার হয়েছে বেশ কিছু অস্ত্র। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ঢোকার প্রবণতাকে উদ্বেগজনক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশনে ঢাকা-চাপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। একটি বগি তল্লাশি করে ৮টি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, গান পাউডার ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এসব অস্ত্র প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত পেরিয়ে দেশে আনা হয়েছে।এছাড়া কিছুদিন আগে অপারেশন ফার্স্ট লাইটে রাজশাহী অঞ্চলের পদ্মার চর থেকে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর ও রাজশাহীর দুর্গম চরে সক্রিয় থাকা ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অস্ত্র কারবারে জড়িত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারত সীমান্তবর্তী কুমিল্লা অংশে অস্ত্রের চোরাচালান বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো এই অস্ত্র বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তঘেঁষা কুমিল্লা জেলার সীমান্ত এলাকা প্রায় ১০৬ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। দেশের ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে এ সীমান্ত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ সীমান্ত দিয়ে বিদেশি অস্ত্রের চোরাচালান বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসেই কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশে মোট ৪৬০টি পুলিশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল—তার মধ্যে ১১৪টি থানা (ভাংচুর ৫৮, অগ্নিসংযোগ ৫৬) এবং বিভিন্ন ধরনের ১ হাজার ২৪টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় মোট ৫ হাজার ৭৫৬টি অস্ত্র লুট হয়েছে, যার মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ৪ হাজার ৪১৩টি। এখনো বাকি আছে ১ হাজার ৩৪৩টি অস্ত্র। মোট লুট হওয়া গুলির সংখ্যা ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮২ রাউন্ড, যার মধ্যে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৪৩৪ রাউন্ড উদ্ধার করা হয়েছে। খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে এরই মধ্যে দুই দফায় আকর্ষণীয় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে এলএমজি উদ্ধারে ৫ লাখ টাকা, এসএমজির জন্য দেড় লাখ, চাইনিজ রাইফেলের জন্য ১ লাখ, পিস্তল ও শটগান উদ্ধারে ৫০ হাজার এবং প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী দেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাংলাদেশে আসার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাশুধু নির্বাচনি পরিবেশকেই অস্থিতিশীল করবে না, বরং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ক্ষমতার রূপান্তরের সময়কে লক্ষ্য করে অতীতেও কিছু গোষ্ঠী সীমান্ত ব্যবহার করে অস্ত্র ও বিস্ফোরক ঢোকানোর চেষ্টা করেছে। ওই ধরনের প্রবণতা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য বড় সতর্কবার্তা। নির্বাচন কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে এখনই কঠোর নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, র্যাব ও পুলিশকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও আগাম তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত আছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড, নাশকতা বা সংঘর্ষের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়াও পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ডিসিএন বাংলা/জা.নি.