ডিসিএন বাংলা টিভি নিজস্ব প্রতিবেদন।
হাসান কাজল
৭১ এর প্রজন্ম সাধারণত রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয় ৮০ দশকের প্রথম দিকে। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তাদের রাজনৈতিক স্পৃহা বা শক্তি। এরই মাঝে জ্বলজ্বল করছে ৬২’র শিক্ষা নীতির আন্দোলন ও ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। একটা আদর্শিক জায়গা থেকে, সে সময়ের রাজনীতি চলমান ছিল। বর্তমান রাজনীতি, তার গতি, আদর্শ, সবই হারিয়েছে বলে মনে হয়। শাসক দল,কিংবা বিরোধী দল, সবখানেই চরম আদর্শিক দৈন্যতা, লক্ষ্য করা যায়। বাম ঘরানার রাজনীতিতে পূর্বে ছিল বিভাজনের সমস্যা। তাথ্যিক নানা বিশ্লেষণ নিয়ে, অব্যাহত ভাঙ্গনের মুখে, তারা জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌছানোর আগেই বহুধা বিভক্ত। আজ তাদের মাঝেও দেখা যায়,ক্ষমতার মোহ, পুঁজিবাদী ধ্যান ধারণা। বাস্তবিক অর্থে, সময় এখন আখের গোছানোর। রাজনৈতিক দর্শন, আদর্শ সব এখন ♥মিয়া সাবের গাই♥ ছোট বেলায়, আমার এক শ্রদ্ধা ভাজন ওস্তাদ এর কাছে শুনেছিলাম বাক্যটি। উনি বলতেন, ♦মিয়া সাবের গাই ♦খাতায় আছে গোয়ালে নাই ♦ রাজনৈতিক অবস্থা বর্তমানে তথৈবচ। জনগণের মৌলিক চাহিদা, নাগরিক অধিকার, সাংবিধানিক চর্চা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। এসবের নিয়ে বেশ সোরগোল। বিরোধী দল, সরকারি দল, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক,নেতা, পাতি নেতা,সকলেই এসব নিয়ে হৈ হুল্লোড়, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম সচল রাখেন। রেডিও, টেলিভিশন, পত্র, পত্রিকায় বক্তৃতা বিবৃতি অব্যাহত। শুধু গোয়াল ঘর খালি। একযুগের বেশি সময় ধরে বিরোধী দল কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। অথচ, গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত, শক্তিশালী বিরোধী দল। দেশে কি কোন বিরোধী দল আছে? থাকলেও তা দৃশ্যমান না! বিরোধী দলের অবস্থান স্পষ্ট হতো, যদি দেখা যেত, অধিকার হারা মানুষের পাশে দাড়িয়ে, কেউ অধিকারের কথা বলছে।
আর একটা দেশে যখন কোন বিরোধী দল থাকে না, তখন শাসকদলের, বেপরোয়া হয়ে উঠাই স্বাভাবিক। দেশের বর্তমান সামগ্রিক চিত্র টা এমনই। বিরোধী দলহীন বাংলাদেশ। এই সুযোগে রাজনীতি হয়ে গেছে ট্রেড। এখানে স্পষ্ট করে, বলা যায়, রাজনীতি এখন পেট নীতি, পকেট নীতি। পদ -পদবী, অর্থ, পেশিশক্তি, তেলবাজি, এখন রাজনীতির, প্রধান নিয়ামক শক্তি। আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন, কর্মী বান্ধব নেতৃত্ব নির্বাসনে।
যে কারণে, দেশের প্রধান একটি দল, যেই দল বারবার দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। যেই দলের রয়েছে লক্ষ লক্ষ নিবেদিত প্রাণ কর্মী সমর্থক। তারা মাঠে দাঁড়িয়ে সত্য কথা বলার সাহস রাখেনা। তারা কেউ কেউ পদ বানিজ্য নিয়ে ব্যাস্ত, অনেকেই ফেসবুক গরম করছেন। আবার বেশির ভাগ নেতাকর্মী বড়ো ভাইদের গুণ কীর্তনে ব্যাস্ত। নির্ভেজাল তেলবাজ, তারা, সরিষার তেল, সয়াবিন, ঘি,ডালডা, সব রকম তৈলাক্ত পণ্য নিয়ে, অহর্নিশি দেশ উদ্ধার করছে। অমুক ভাইয়ের জন্মদিনের শুভেচ্ছা, অমুক ভাই না থাকলে, দেশটা খুঁজে পাওয়া যেত না, ইত্যাদি, ইত্যাদি। বড়ো ভাইদের পদ পদবি ঠিক রাখতে, ছোট ভাইদের কি দরদ! কে কতগুলি মামলা খেয়েছে, তার খতিয়ান হিসাব লিখতে ভুলেন না,তেল ওয়ালারা। দুর্ভাগ্য হলো এখানে প্রকৃত, ত্যাগি নেতা-কর্মীদের নামে মামলা হয়, আন্দোলন, সংগ্রাম করার কারণেই। কিন্তু বেশির ভাগ নেতাকর্মী মামলা খায়, শশুর বাড়ি দাওয়াত খেয়ে। আরেক গ্রুপ আছে, ৫/৭ জন মিলে ফেসবুকে ছবি তুলে ভোঁ দৌড়।
এসব অনেক কথা। যারা নিজরাই মাঠে নামতে পারে না! তারা জনগণের কথা কি বলবে। সরকারি দলের অবস্থা মর্মে মর্মে উপলব্ধি হচ্ছে। রাজনীতি কিভাবে করতে হয়, জনগণকে তারা শিখিয়ে দিচ্ছে। উন্নয়নের নামে,স্বাধীনতার, স্বপ্ন -স্বাদ সব ভু লুন্ঠিত। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। সত্য টা চোখে আঙুল দিয়ে, দেখাতে গেলে,গুজব ছড়ানোর অভিযোগ। সভা, সমাবেশে কিছু বলতে গেলে, গণতন্ত্র বিনষ্টকারী হিসেবে, গুন্ডা, পুলিশ মিলে পিটানো হয়।
সম্প্রতি কিছু কিছু ছাত্র, যুবক, স্বতন্ত্র ব্যানারে সাহস নিয়ে মাঠে নামছে। ছাত্র অধিকার পরিষদ, কিছু বাম সংগঠন, তারা জনগণের দাবি নিয়ে, আন্দোলন সংগ্রাম করছে। যে কথায় শুরু করেছিলাম, ৮১ থেকে ৯০ -৯ বছর আমরা, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছিলাম। রাজনৈতিক ঐক্য ছিল ৭দল, ৮দল,৫দল আরও দু’একটা দল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, ছাত্র ঐক্য পরিষদ, ৯ বছরের গণআন্দোলন। অনেক ছাত্র, জনতার তাজা খুনের বিনিময়ে, গণতন্ত্রের বিজয়। কিন্তু একটা বিষয় পরিস্কার হচ্ছে না! তখন আমরা যারা ছাত্র ছিলাম, প্রতিদিন, সকাল -বিকাল, মিছিল, মিটিং প্রতিবাদ সভা করতাম, গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য। তখন গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা করতাম। সে সময় কেউ পিটায়নি! আমরা ৯০ এ গণতন্ত্র মুক্ত করেছি, এখন কথা বলতে গেলে, মিছিল করতে গেলে, প্রতিবাদ সভা করতে গেলে, পুলিশ পিটায়,গুন্ডারা পিটায়! এবার বুঝতে পারছি না, কোনটা গণতন্ত্র? ৯০ আগের সময়ের টা, নাকি ২০২১ খৃষ্টাব্দের বাস্তবতা। রাজনীতি এখন কার হাতে? সন্ত্রাসী,চাঁদাবাজ, মাস্তান বাহিনীর হাতে। কি অবলীলায় তারা জনগণের রক্ত শুষে খায়। রাজনীতি ছিল জনগণের কল্যাণে, মানবতার সেবকগণ রাজনীতি করতেন, মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা,অর্থনৈতিক মুক্তি,সাংবিধানিক অধিকার, ন্যায় বিচার ও মানবতার মুক্তির জন্য। এখন রাজনীতি হয় নেতাদের, আখের গোছানোর জন্য। রাজনীতিতে এখন প্রতিবাদের ভাষা নেই, আছ তৈলাক্ত মাঠ। তেলময় নষ্ট আবহে -রাজনীতি এবার “দুষ্ট গ্রহের -নষ্ট নীড়ে”
ডিসিএন বাংলা টিভি নিউজ ডেক্স/