তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবে ‘দেশ ও রাজনীতির নিরাপত্তার স্বার্থে’ একটি সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
যুক্তরাজ্য সফররত ইউনূস বুধবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের রয়্যাল ইন্সটিউট অফ
আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল বলা যায় কি না– সেই প্রশ্ন তুলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবে ‘দেশ ও রাজনীতির নিরাপত্তার স্বার্থে’ একটি সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে, সেটা বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
যুক্তরাজ্য সফররত ইউনূস বুধবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স আয়োজিত এক সংলাপে অংশ নেন।
সেখানে তাকে সঞ্চালক প্রশ্ন করেন, যে জুলাই চার্টার হচ্ছে, সমালোচকরা বলছেন, অনেক রাজনৈতিক দলকে এর বাইরে রাখা হচ্ছে, যারা এই চার্টারের সাথে একমত নয়, যেমন আওয়ামী লীগ; তাদের জন্য কোনো জায়গা রাখছেন না। সুতরাং, মানুষকে কোনো বিকল্প দেওয়া হচ্ছে না। তারা বলছে, এটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, এটা অনেক সুন্দর শব্দে মোড়ানো এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ, যা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক।
উত্তরে ইউনূস বলেন, “হ্যাঁ, এটা নিয়েও বিতর্ক আছে। বিতর্ক হচ্ছে—আওয়ামী লীগ কি আদৌ রাজনৈতিক দল? যদি তারা রাস্তায় তরুণদের গুলি করে হত্যা করতে পারে, মানুষকে গুম করতে পারে, টাকা চুরি করতে পারে, তাহলে আপনি কি এটাকে এখনো রাজনৈতিক দল বলবেন? এটাই বিতর্ক। এটা কোনো সিদ্ধান্ত নয়।”
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন অবসানের ঘটনাপ্রবাহ মনে করিয়ে দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “ঘটনাটা শুরু হয় ৫ অগাস্ট, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশ ত্যাগ করেন। তখন সারাদেশজুড়ে মানুষ উদযাপন করছিল—অবশেষে আমরা মুক্ত। সুতরাং, আমরা ভেবেছিলাম যে ৫ অগাস্টই সবকিছুর ইতি, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এই অধ্যায় শেষ। এখন এটি একটি নতুন দেশ, যেখানে তারা নেই।
“কিন্তু যারা পালিয়ে গেছে, তাদের জন্য এটা তখনো শেষ হয়নি। তারা এখনও আরেক দেশ থেকে একই কাজ করে যাচ্ছে, মানুষকে উসকে দিচ্ছে, রাস্তায় সংঘর্ষ করছে। এখন ১০ মাস পার হয়ে গেছে, কিন্তু ওই দলগুলোর কেউই এখন পর্যন্ত কোনো অনুশোচনা বা দুঃখ প্রকাশ করেনি। কেউ বলেনি, ‘এই ঘটনার দায় আমার নয়, তবে আমি এতে জড়িত ছিলাম বলে খুব কষ্ট পাচ্ছি।’ কেউ বলেনি। ফলে, আমাদের কাছে এটা শেষ, কিন্তু তাদের কাছে এটা এখনও চলছে।”
জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের দাবির মুখে মে মাসে আইন সংশোধন করে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের পথ তৈরি করে ইউনূসের সরকার। আর সেই বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
কেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তার একটি ব্যাখ্যা ইউনূস এই আলোচনায় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “আমরা রাস্তায় নিরাপদ বোধ করি না, তারা এই আন্দোলনের নেতাদের হুমকি দিচ্ছে। তাই দেশের নিরাপত্তা, রাজনীতির নিরাপত্তার স্বার্থে, জাতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে আপাতত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। আমরা শুধু এটুকুই করেছি। আমরা তাদের নিষিদ্ধ করিনি। আমরা কিছুই করিনি, যতক্ষণ না বিচার শেষ হচ্ছে। এখন কেবল ওইসব মানুষের বিচার চলছে যারা অভিযুক্ত।”
ইউনূস বলেন, এখন যদি এই বিচার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দিতে বলা হয়, তাহলে সেটা ‘ঠিক হবে না’।
বিচার, সংস্কার আর নির্বাচন–এই তিন দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “যারা আমাদের দায়িত্ব নিতে বলেছে, তারা আমাদের তিনটি কাজ দিয়েছে। আমরা সেই তিনটি কাজ গ্রহণ করেছি, এবং সেই পথেই এগোচ্ছি।”
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়নের যে অভিযোগ কেউ কেউ করছে, সে বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া জানতে চান সঞ্চালক।
উত্তরে ইউনূস বলেন, “এটা মিথ্যা। একেবারে সত্য নয়। তারা এর আগে কখনো এত স্বাধীনতা পায়নি। তারা যা খুশি বলতে পারছে।”
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জুলাই মাসে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের উপস্থিতিতে জুলাই চার্টার ঘোষণা করে তার ভিত্তিতেই আগামী নির্বাচন হবে।
সংস্কারের বিষয়গুলো গণভোট দেওয়া হচ্ছে না কেন– এ প্রশ্নের উত্তরে ইউনূস বলেন, অনেকে মনে করেন গণভোট অর্থহীন।
“কারণ অনেকে বুঝবেন না যে কেন এই গণভোট। সে কারণে দলগুলো সবাই সম্মত হলে সেটা হবে বেশি বাস্তবসম্মত।”
নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে বাংলাদেশে যে বিতর্ক চলছে, সে বিষয়টি সামনে এনে সঞ্চালক বলেন, “সব মিলিয়ে অনেকে বলছেন, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না।”
জবাবে ইউনূস বলেন, এটা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচন’।
“সময় ঠিক আছে, জনগণও প্রস্তুত। সতের বছর পর আপনি একটি সত্যিকারের নির্বাচন পাচ্ছেন। দেশের মানুষের মনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যে তারা সত্যিই ভোট দিতে যাচ্ছে।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আগামী নির্বাচন একটি নতুন সরকার নির্বাচনের রুটিন ভোট হবে না, এটা হবে ‘নতুন বাংলাদেশের’ জন্য ভোট।
“আমরা পুরনো বাংলাদেশকে বিদায় বলে নতুন বাংলাদেশ তেরি করতে চাই,” বলেন তিনি।
ডিসিএন বাংলা টিভি/