হত্যাকাণ্ড, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অপরাধের অপরাধী বগুড়ার হেলাল হোসেন (৪৫) ওরফে ‘খুনি হেলাল’ ওরফে ‘দুর্ধর্ষ হেলাল’। এরপর নাম ও বেশভূষা বদলিয়ে হয়ে ওঠেন বাউল সেলিম।
তবে বাউলের বেশ ধারণের পর তিনি ‘সেলিম ফকির’ নামে পরিচিত লাভ করে। পথে পথে ঘোরার পর অবশেষ নিরাপদ স্থান হিসেবে খুঁজে নেন বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনে। গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন হেলাল ওরফে সেলিম ফকির। গান গাওয়ার কণ্ঠ ভালো হওয়ায় এরইমধ্যে নজরে পড়েন এক ইউটিউবারের সঙ্গে। তার হাত ধরেই শুরু হয় বাউল গানের মডেল হিসেবে।
তবে তার কপাল পুড়ে ‘ভাঙ্গা তরী ছেঁড়া পাল’ গানে, যে গানে তিনি বাউল মডেল হিসেবে অভিনয় করেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে মডেলিং করা তার এই গানটি বছরখানেক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তার গান ভাইরাল হওয়াই কাল হয় হেলালের। পরিচিতজনরা তাকে চিনে ফেলেন। তার পরিচয় নিশ্চিত হন স্থানীয়রা। এরপর হেলালের বেশভূষা বদলের তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ দেয় র্যাবে।
স্থানীয়দের করা অভিযোগগুলো মেলাতে থাকেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। প্রায় ছয় মাস চেষ্টার পর র্যাবের গোয়েন্দারা তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হন। বুধবার (১২ জানুয়ারি) রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে হেলাল হোসেন ওরফে খুনি হেলাল ওরফে সেলিম ফকিরকে গ্রেফতার করে র্যাব। তাকে গ্রেফতারের পর র্যাব জানায়, তিনটি হত্যা মামলায় জড়িত হেলাল খুনের দায় এড়াতে বিশ বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্নস্থানে ফকির ও বাউল ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়িয়েছে।
জনপ্রিয় গান ভাঙ্গা তরী ছেড়া পাল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে ভিউ কয়েক মিলিয়ন। আর এ গানেরই বাউল মডেল সেলিম ফকির বা বাউল সেলিম ওরফে হেলাল হোসেন। সে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। গত ১২ জানুয়ারি খুনের মামলায় কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে হেলালকে গ্রেফতার করে র্যাব।
এ নিয়ে বৃহস্পতিবার (১৩ জানুয়ারি) সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন জানান, ২০০১ সালে বগুড়ার চাঞ্চল্যকর মাহমুদুল হাসান বিদ্যুৎ হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি হেলাল, ১৯৯৭ সালে বগুড়ার বিষ্ণু হত্যা মামলা এবং ২০০৬ সালে রবিউল হত্যা মামলার আসামি সে। রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাও তার বিরুদ্ধে।
খন্দকার আল মঈন আরও জানান, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে ২১ বছর বয়সে প্রথমে হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে খুনি ও দুর্ধর্ষ হেলাল নামে পরিচিতি পায়। দীর্ঘসময় আত্মগোপনে থাকার পর ২০১৫ সালে চুরির এক মামলায় গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেটের মাজারে ফকির ছদ্মবেশে ও বিভিন্ন রেলস্টেশনে বাউল বেশে জীবনযাপন করতে থাকে সে।
তিনি বলেন, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা তার আর বাড়ি বগুড়ায়। এক সময় মুদিখানার দোকান চালাত সে। পরে হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। গ্রেফতার এড়াতে ছদ্মবেশে বিভিন্ন মাজার ও রেলওয়ে স্টেশনে থাকা শুরু করেন। কেউ যাতে তার চেহারা চিনতে না পারেন, সেজন্য লম্বা দাঁড়ি ও চুলও রাখেন। একটি বাউল গানের শুটিংয়ের সময় তাকে মডেল হিসেবে অভিনয় করানো হয়। সেই গানের ভিডিও দেখে স্থানীয়রা শনাক্ত করেন বাউল ছদ্মবেশী সেলিম ফকির আসলে একজন খুনি। তিনিই খুনি হেলাল।
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, ছয় মাস আগে এক ব্যক্তি ইউটিউবে প্রচারিত একটি গানের বাউল মডেল সম্পর্কে র্যাবের কাছে তথ্য দেন। তখন জানানো হয়, এই বাউল মডেল সম্ভবত বগুড়ার বিদ্যুৎ হত্যা মামলার আসামি। অভিযোগ পেয়ে র্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। একপর্যায়ে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। হেলাল আরও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা তা খুঁজে দেখার কথা জানিয়েছে র্যাব। পাঁচ বছর আগে নারায়ণগঞ্জের রেলস্টেশনে একটি গানের শুটিং চলাকালে তাকে একজন মিউজিক ভিডিওতে অভিনয়ের প্রস্তাব তাকে।
তার যত অপরাধ,
২০০১ সালে বগুড়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাহমুদুল হাসান বিদ্যুৎকে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডে নিহতের পরিবারের একজন সদস্য বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেন। ২০০৬ সালে রবিউল নামে এক ব্যক্তিকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। সেই মামলায়ও হেলাল চার্জশিটভুক্ত আসামি।
এছাড়া ১৯৯৭ সালে বগুড়ার বিষ্ণু হত্যা মামলারও এজাহারভুক্ত আসামি সে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। এছাড়া ২০১০ সালে বগুড়া সদর থানায় একটি চুরির মামলায় ২০১৫ সালে গ্রেফতার হন হেলাল ওরফে বাউল হেলাল। তাছাড়া নারী নির্যাতন আইনেও তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে। খুনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে নিজ এলাকায় ‘দুর্ধর্ষ হেলাল’, ‘খুনি হেলাল’ নামে পরিচিতি পান তিনি।
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা জানা মুদি দোকানদার হেলাল ২০১০ সালে চুরির মামলায় গ্রেফতার হন। এরপর ২০১৫ সালে জামিন পান। ওইদিনই বিদ্যুৎ হত্যা মামলার রায় হয়। রায়ে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন। আদালতে হাজির না হয়ে তিনি সুকৌশলে এলাকা ছাড়েন। এরপর শুরু হেলালের শুরু হয় ফেরারি জীবন।
র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে হেলাল জানিয়েছেন, প্রথমে তিনি বগুড়া থেকে ট্রেনে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আসেন। পরে কমলাপুর থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম। সেখানে আমানত শাহের মাজারে ছদ্মবেশ ধারণ করে বেশ কিছুদিন অবস্থান করে এরপর ট্রেনে সিলেটের হজরত শাহজালাল মাজারে চলে যান। সেখানে ছদ্মবেশ ধারণ করে আরও কিছুদিন অবস্থান করেন। এভাবে তিনি বিভিন্ন রেলস্টেশন ও মাজারে ছদ্মবেশে অবস্থান করেন।
সবশেষ কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনে গিয়ে নাম-ঠিকানা ও পরিচয় গোপন করেন হেলাল। নিজেকে সেলিম ফকির নামে পরিচয় দেন। সেখান থেকে তিনি সেলিম ফকির নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ২০১৭ সালের দিকে হেলাল নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে কিশোর পলাশ ওরফে গামছা পলাশের একটি গানের শুটিং চলাকালে রেললাইনের পাশে বাউল গান গাচ্ছিলেন। তখন এক ব্যক্তি তাকে গানের মিউজিক ভিডিওতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। এরপর বহুল জনপ্রিয় ‘ভাঙ্গা তরী ছেঁড়া পাল’ গানে মডেল হন হেলাল হোসেন ওরফে সেলিম ফকির।
স্টেশনে চার বছর: যাবজ্জীবন দণ্ডের পর পলাতক হেলাল প্রায় সাত বছর ফেরারি জীবনযাপন ছিল। সর্বশেষ চার বছর তিনি কাটিয়ছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে। সেখানে স্টেশনের পাশেই এক নারীকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। স্টেশনে বাউল গান শুনিয়ে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অর্থেই চলতো তার সংসার।
ডিসিএন বাংলা/অ.নি.